ওভারভিউ
ডিসেক্টমি (Discectomy) হলো মেরুদণ্ডের ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কের (intervertebral disk) কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ করার একটি শল্যচিকিৎসা বা সার্জারি। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কগুলো মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলোর (vertebrae বা হাড়) মাঝখানে অবস্থিত চ্যাপ্টা, গোল কুশনের মতো এবং এগুলো মেরুদণ্ডের শক অ্যাবজরবার (shock absorber) বা অভিঘাত শোষক হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি ডিস্কের কেন্দ্রস্থলে নিউক্লিয়াস পালপোসাস (nucleus pulposus) নামক একটি নরম, জেলের মতো পদার্থ থাকে, যা অ্যানুলাস (annulus) নামক একটি নমনীয় বাইরের রিং দ্বারা বেষ্টিত থাকে। বিশেষ করে, ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কগুলো নিয়মিত চাপের মধ্যে থাকে। এর ফলে, ডিস্ক ছিঁড়ে যেতে পারে এবং এর ভেতর থেকে কিছু জেলের মতো নিউক্লিয়াস পদার্থ লিক হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। এই অবস্থাকে হার্নিয়েটেড ডিস্ক (herniated disk) বলা হয়, যা বাল্জড (bulging), স্লিপড (slipped) বা রাপচারড ডিস্ক (ruptured disk) নামেও পরিচিত। ফলস্বরূপ, এটিই ডিসেক্টমি করানোর প্রধান কারণ।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, হার্নিয়েটেড ডিস্ক প্রধানত পিঠের নিচের অংশকে প্রভাবিত করে, যাকে কটিদেশীয় মেরুদণ্ড বা লাম্বার স্পাইন (lumbar spine) বলা হয়, তবে এর পাশাপাশি এটি ঘাড়ের অংশকেও প্রভাবিত করে, যাকে সার্ভিকাল স্পাইন (cervical spine) বলা হয়। তবে, হার্নিয়েটেড ডিস্কের খুব কম দেখা যায় এমন একটি স্থান হলো পিঠের মধ্যভাগ।
ভারতে ডিসেক্টমি (Discectomy), বানানটি অনেক সময় diskectomy-ও লেখা হয়।
ডিসেক্টমির প্রকারভেদ
ডিসেক্টমি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এখানে আমরা সার্জিক্যাল পদ্ধতি এবং অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ডিসেক্টমির প্রকারভেদগুলো সম্পর্কে জানব:
ওপেন বা স্ট্যান্ডার্ড ডিসেক্টমি (SD): এটি একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি বড় ছেদ (incision) বা কাটা স্থান তৈরি করেন এবং পেশীগুলোকে পাশে সরিয়ে নেন যাতে তাদের ওই এলাকায় সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকে এবং তারা ডিস্কের অপারেশন করতে পারেন।
মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি (MIS) ডিসেক্টমি: সার্জন ত্বকে একটি ছোট ছেদ তৈরি করেন এবং তারপর পেশীর মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করার জন্য ডাইলেটর (dilators) নামক বড় টিউব ব্যবহার করেন। একটি ছোট জায়গার ভেতর দেখতে এবং অপারেশন করতে সার্জনকে সাহায্য করার জন্য এন্ডোস্কোপ নামক বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই সার্জারির অন্যান্য কিছু সংস্করণ হলো মাইক্রো এন্ডোস্কোপিক ডিসেক্টমি এবং ফুল এন্ডোস্কোপিক ডিসেক্টমি।
অ্যান্টেরিওর সার্ভিকাল ডিসেক্টমি অ্যান্ড ফিউশন: এই সার্জারিটি ঘাড়ের জন্য অর্থাৎ সার্ভিকাল স্পাইনের জন্য করা হয়। সার্জন ঘাড়ের সামনের অংশ (অ্যান্টেরিওর) থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ডিস্কটি অপসারণ করেন এবং এর পরে স্পাইনাল ফিউশন করেন। স্পাইনাল ফিউশন বলতে ডিস্কটিকে তার আগের সঠিক অবস্থানে প্রতিস্থাপন করার জন্য একটি বোন গ্রাফট (bone graft) বা ইমপ্লান্ট স্থাপন করা বোঝায়। এটি ঘাড়ে স্থায়িত্ব এবং শক্তি প্রদান করে।
ডিসেক্টমি করানোর কারণ
হার্নিয়েটেড ডিস্ক হলো ডিসেক্টমি করানোর অন্যতম প্রধান কারণ। তবে হ্যাঁ, সবাইকে এই সার্জারি করানোর পরামর্শ দেওয়া হয় না। হার্নিয়েটেড ডিস্কের সমস্যায় আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এনএসএআইডি (NSAIDs), ফিজিক্যাল থেরাপি এবং ওষুধের মতো অস্ত্রোপচারবিহীন চিকিৎসাও করা যেতে পারে। কিন্তু যদি ব্যথা আপনাকে ঘুমাতে না দেয়, অথবা অস্ত্রোপচারবিহীন চিকিৎসা লক্ষণগুলো উপশম করতে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে ডাক্তার হার্নিয়েটেড ডিস্কের জন্য ডিসেক্টমির পরামর্শ দিতে পারেন এবং আরও কিছু কারণের মধ্যে রয়েছে:
- নিতম্ব বা পায়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা
- বাহু, পায়ের নিচের অংশ বা নিতম্বে তীব্র দুর্বলতা
- পায়ে বা হাতে তীব্র ব্যথা বা অসাড়তা
ডিসেক্টমির পদ্ধতি
পদ্ধতি শুরু করার আগে রোগীকে জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া (general anesthesia) দেওয়া হয় যাতে রোগী গভীর ঘুমের মধ্যে থাকেন এবং সার্জারি চলাকালীন কোনো ব্যথা অনুভব না করেন।
এখন, একটি ওপেন ডিসেক্টমির ক্ষেত্রে সার্জন প্রভাবিত অঞ্চলের ঠিক ওপরে পিঠের মাঝখানে ত্বকে প্রায় ১ থেকে ২ ইঞ্চি একটি ছেদ তৈরি করেন। মেরুদণ্ডে প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর ওপরের পেশীগুলো সরাসরি সরিয়ে ফেলা হয়।
মিনিমালি ইনভেসিভ লাম্বার ডিসেক্টমির জন্য, সার্জন ফ্লুরোস্কোপি (fluoroscopy) নামক একটি বিশেষ এক্স-রে ব্যবহার করে ঠিক কোন কশেরুকা এবং ডিস্কটি প্রভাবিত হয়েছে তা খুঁজে বের করার জন্য ত্বকের মধ্য দিয়ে খুব পাতলা সুঁচ প্রবেশ করান। ঘাড়ের মিডলাইনের কাছে ছোট ছেদ তৈরি করা হয়।
অতঃপর, সার্জন হার্নিয়েটেড ডিস্কের সমস্ত অংশ বা কিছু অংশ অপসারণ করতে একটি বিশেষ ধরণের যন্ত্র বা টুল ব্যবহার করেন।
সর্বশেষে, ডিস্ক অপসারণ বা ফিউশন করার পরে, সার্জন পেশী এবং ত্বককে আবার একসাথে যুক্ত করে ছেদটি সেলাই করে বন্ধ করে দেন।
ডিসেক্টমির ঝুঁকি এবং জটিলতা
ডিসেক্টমির কিছু ঝুঁকি এবং জটিলতার মধ্যে রয়েছে:
- রক্ত জমাট বাঁধা (ব্লাড ক্লট)
- অ্যানেস্থেসিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- ইনফেকশন বা সংক্রমণ
- রক্তপাত
- স্নায়ুর ক্ষতি
- সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড লিক (মেরুদণ্ডের তরল পদার্থ লিক হওয়া)
অন্যান্য কিছু জটিলতার মধ্যে রয়েছে:
- ব্যথা বা লক্ষণগুলোর কোনো উন্নতি না হওয়া
- অস্থির মেরুদণ্ডের কারণে আরেকটি সার্জারির প্রয়োজনীয়তা
- হার্নিয়েটেড ডিস্কের পুনরাবৃত্তি যার জন্য আবার সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে
ভারতে ডিসেক্টমির খরচ
অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় ভারতে ডিসেক্টমির খরচ কম এবং এটি সাশ্রয়ী। প্রকৃতপক্ষে, সবচেয়ে দক্ষ উন্নত চিকিৎসা প্রদানে ভারত শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি।
যহোক, চিকিৎসার মোট খরচ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে, যেমন হাসপাতালের পছন্দ, হাসপাতালে থাকার সময়কাল, সার্জনের দক্ষতা, সার্জারির ধরণ, সার্জারিতে ব্যবহৃত উপাদান এবং আরও অনেক কিছু।
সারাংশ
ডিসেক্টমি হলো মেরুদণ্ডের ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ করার একটি শল্যচিকিৎসা।
এই অবস্থাকে হার্নিয়েটেড ডিস্ক বলা হয়, যা বাল্জড, স্লিপড বা রাপচারড ডিস্ক নামেও পরিচিত। ফলস্বরূপ, এটিই ডিসেক্টমি করানোর প্রধান কারণ।




